যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট গভর্নেন্স মডেল: এক-স্তর বোর্ড, SEC ও Sarbanes-Oxley
04 অক্টো 2026 তারিখে প্রকাশিত
আমাদের কর্পোরেট গভর্নেন্স কী নিয়ে প্রথম লেখায় আমরা OECD-এর চারটি স্তম্ভ এবং বাংলাদেশের বিএসইসি কোড-২০১৮ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কিন্তু গভর্নেন্সের নিয়মকানুন পৃথিবীর সব জায়গায় একই রকম নয়, প্রতিটি দেশের ইতিহাস, আইনি কাঠামো ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তার গভর্নেন্স মডেলকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলে। এই সিরিজে আমরা দশটি লেখায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গভর্নেন্স মডেল ঘুরে দেখব, শুরু করছি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুঁজিবাজারের দেশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
এক-স্তর বোর্ড (One-Tier Board) মডেল কী
যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো সাধারণত একটি একক বোর্ড অব ডিরেক্টরস দ্বারা পরিচালিত হয়, যাকে বলা হয় এক-স্তর বা one-tier বোর্ড মডেল। এই একটি বোর্ডের মধ্যেই নির্বাহী পরিচালক (এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, যেমন সিইও) এবং স্বাধীন বা নন-এক্সিকিউটিভ পরিচালক, দুই ধরনের সদস্যই একসাথে বসেন। এটি আমাদের বিএসইসি কোড-২০১৮ এর কাঠামোর সাথে অনেকটা মিলে যায়, কারণ বাংলাদেশও মূলত এই এক-স্তর মডেল অনুসরণ করে। এর বিপরীতে জার্মানির মতো কিছু দেশে দুই-স্তর বা two-tier বোর্ড কাঠামো প্রচলিত, যা নিয়ে আমরা এই সিরিজের পরের একটি লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করব।
যুক্তরাষ্ট্রের এক-স্তর কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে চেয়ারম্যান এবং সিইও একই ব্যক্তি হওয়া বেশ সাধারণ একটি চর্চা, যাকে বলা হয় "CEO duality"। যুক্তরাজ্যের কোডে যেমন এই দুই পদ আলাদা রাখার কথা জোরালোভাবে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে তেমন কোনো কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এটি নিয়ে বিনিয়োগকারী ও গভর্নেন্স বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আছে, কারণ একই ব্যক্তি যখন বোর্ডের প্রধান এবং দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার প্রধান, তখন বোর্ডের স্বাধীন তদারকি করার ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, একই ব্যক্তি চেয়ারম্যান ও সিইও হলে আসলে কী ঝুঁকি তৈরি হয়?
বোর্ডের মূল কাজগুলোর একটি হলো সিইও-র কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনে প্রশ্ন তোলা। যখন সিইও নিজেই বোর্ড সভার আলোচ্যসূচি ঠিক করেন এবং সভা পরিচালনা করেন, তখন তার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর কঠোর প্রশ্ন তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এই ঝুঁকি সামলাতে অনেক কোম্পানি একজন "লিড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর" নিয়োগ দেয়, যিনি স্বাধীন পরিচালকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলার দায়িত্ব নেন।
SEC: যুক্তরাষ্ট্রের মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা
Securities and Exchange Commission বা SEC হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের অধীনে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, যা ১৯৩৪ সালে Securities Exchange Act এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯২৯ সালের বিখ্যাত শেয়ারবাজার ধসের পরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। SEC মূলত তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে। আমাদের বিএসইসি যেমন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দেখে, SEC একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের NYSE ও NASDAQ-এর মতো এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ তদারকি করে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানি আইন মূলত রাজ্য পর্যায়ে তৈরি হয়, ফেডারেল পর্যায়ে নয়, এবং বেশিরভাগ বড় কোম্পানিই ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত, কারণ সেখানকার কোম্পানি আইন (Delaware General Corporation Law) প্রতিষ্ঠিত ও পূর্বাভাসযোগ্য বলে পরিচিত।
গল্পে বলি
২০০১ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় এনার্জি কোম্পানি, Enron, যা তখন দেশের সপ্তম বৃহত্তম কোম্পানি বলে বিবেচিত হতো, হঠাৎ দেউলিয়া হয়ে যায়। তদন্তে প্রকাশ পায়, কোম্পানিটি জটিল বিশেষ-উদ্দেশ্য সত্তা বা special purpose entities ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ দায় তার হিসাবের বইয়ে না দেখিয়ে বাইরে রেখেছিল, ফলে কোম্পানির আর্থিক অবস্থা প্রকৃত অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো দেখাচ্ছিল। যে অডিট ফার্ম, Arthur Andersen, এই হিসাব পরীক্ষা করছিল, তারাও পরে এই কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত থাকার দায়ে ভেঙে যায়। হাজারো কর্মী তাদের চাকরি এবং অবসর তহবিল হারান, কারণ তাদের পেনশন তহবিলের একটি বড় অংশ নিজের কোম্পানির শেয়ারেই বিনিয়োগ করা ছিল।
এই ঘটনার কয়েক মাস পরেই আরেকটি বড় টেলিকম কোম্পানি, WorldCom, প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের হিসাব জালিয়াতির কথা স্বীকার করে, যেখানে সাধারণ খরচকে মূলধনি বিনিয়োগ হিসেবে দেখিয়ে মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। এই দুটি ঘটনা মিলে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে এমন আস্থার সংকট তৈরি করে, যার জবাবে মার্কিন কংগ্রেস রেকর্ড গতিতে একটি নতুন আইন পাস করে, যা আমরা পরের অংশে আলোচনা করব।
Sarbanes-Oxley Act (SOX), ২০০২
Enron ও WorldCom কেলেঙ্কারির সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস Sarbanes-Oxley Act পাস করে, যা সংক্ষেপে SOX নামে পরিচিত। এই আইন কর্পোরেট গভর্নেন্স ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বলে বিবেচিত হয়। এর কয়েকটি মূল দিক নিচে আলোচনা করা হলো।
- সিইও ও সিএফও-র ব্যক্তিগত সত্যায়ন। প্রতিটি আর্থিক প্রতিবেদনে সিইও ও সিএফওকে ব্যক্তিগতভাবে স্বাক্ষর করে সত্যায়ন করতে হয় যে প্রতিবেদনটি সঠিক, মিথ্যা সত্যায়নের ফলে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় তৈরি হয়।
- অডিট কমিটির স্বাধীনতা। অডিট কমিটির সব সদস্যকে স্বাধীন হতে হয় এবং অন্তত একজন সদস্যের আর্থিক বিশেষজ্ঞ হওয়া প্রয়োজন।
- অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ মূল্যায়ন (Section 404)। ব্যবস্থাপনাকে নিজেই তার অভ্যন্তরীণ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে প্রতিবেদন দিতে হয়, এবং বহিরাগত নিরীক্ষক তা যাচাই করেন।
- নিরীক্ষা ও পরামর্শী সেবার বিভাজন। যে ফার্ম একটি কোম্পানির আর্থিক নিরীক্ষা করে, সেই ফার্মকে একই সাথে উচ্চমূল্যের পরামর্শী সেবা দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়, যাতে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো যায়।
কোম্পানিগুলো সাধারণত যেসব ভুল করে
-
1
নিরীক্ষককে একই সাথে পরামর্শী সেবাদাতা বানানো
Enron-এর ক্ষেত্রে Arthur Andersen একই সাথে নিরীক্ষা এবং লাভজনক পরামর্শী সেবা দিচ্ছিল, যা স্বাধীন মতামতের সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দেয়।
-
2
জটিল কাঠামোর মাধ্যমে দায় আড়াল করা
বিশেষ-উদ্দেশ্য সত্তার মাধ্যমে দায় মূল হিসাবের বাইরে রাখা স্বচ্ছতার মূল নীতিকেই লঙ্ঘন করে, যদিও কাগজে-কলমে তা আইনসিদ্ধ দেখানো যেতে পারে।
-
3
কর্মীদের অবসর তহবিল একক শেয়ারে কেন্দ্রীভূত রাখা
কোম্পানির শেয়ার ধসে পড়লে কর্মীরা একই সাথে চাকরি ও সঞ্চয়, দুটোই হারান, যা ঝুঁকি বিকেন্দ্রীকরণের মূল নীতির বিরুদ্ধে।
-
4
বোর্ডের তদারকি ক্ষমতাকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ করা
Enron-এর বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে বিশেষ-উদ্দেশ্য সত্তাগুলো অনুমোদন করেছিল, কিন্তু প্রকৃত ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই, যা তদারকিকে অর্থহীন করে তোলে।
| বিষয় | ধাপ |
|---|---|
| বিশেষ-উদ্দেশ্য সত্তায় দায় আড়াল | ১ |
| অক্টোবর ২০০১: অভ্যন্তরীণ সমস্যা প্রকাশ | ২ |
| ডিসেম্বর ২০০১: Enron দেউলিয়া ঘোষণা | ৩ |
| Arthur Andersen-এর পতন | ৪ |
| জুলাই ২০০২: Sarbanes-Oxley Act পাস | ৫ |
Dodd-Frank Act এবং ২০০৮-এর পরের সংস্কার
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র আরও একটি বড় সংস্কার আইন পাস করে, Dodd-Frank Wall Street Reform and Consumer Protection Act, ২০১০ সালে। SOX মূলত হিসাব জালিয়াতি ও আর্থিক প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল, আর Dodd-Frank মূলত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি গ্রহণ এবং নির্বাহীদের বেতন-ভাতার সাথে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সামঞ্জস্য নিয়ে কাজ করে। এই আইনের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের নির্বাহী বেতন-ভাতার ওপর "say-on-pay" ভোট দেওয়ার অধিকার তৈরি হয়, যদিও এই ভোট বাধ্যতামূলক নয়, বরং পরামর্শমূলক।
গল্পে বলি
২০০৮ সালের সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বড় ব্যাংক এবং বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান স্বল্পমেয়াদি মুনাফার লক্ষ্যে অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ও জটিল আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগ করেছিল। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহীদের বোনাস কাঠামো এমনভাবে সাজানো ছিল যে স্বল্পমেয়াদি মুনাফা বাড়ালেই বড় বোনাস পাওয়া যেত, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির জন্য কোনো ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হতো না। সংকট শুরু হওয়ার পর বিশ্লেষকরা দেখেন, এই ধরনের বেতন কাঠামোই অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করেছিল, কারণ লাভ হলে ব্যক্তিগত বোনাস, আর ক্ষতি হলে তার বোঝা পড়ত শেয়ারহোল্ডার ও করদাতাদের ওপর। এই শিক্ষা থেকেই Dodd-Frank-এ নির্বাহী বেতন-ভাতার স্বচ্ছতা ও শেয়ারহোল্ডার তদারকি বাড়ানোর বিধান যুক্ত হয়।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, নির্বাহীর বেতন কাঠামো কীভাবে পুরো একটি প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি গ্রহণের আচরণ বদলে দিতে পারে?
যদি একজন নির্বাহীর বোনাস সম্পূর্ণভাবে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার সাথে যুক্ত থাকে, তিনি স্বাভাবিকভাবেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত হবেন যা আজকের মুনাফা বাড়ায়, এমনকি তা যদি কয়েক বছর পর বড় ক্ষতির কারণ হয়। এ কারণেই আধুনিক গভর্নেন্স চর্চায় নির্বাহী বেতনের একটি অংশ শেয়ার বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতার সাথে যুক্ত রাখার এবং "ক্লবব্যাক" সুযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে পরে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে বোনাস ফেরত নেওয়া যায়।
শেয়ারহোল্ডার-কেন্দ্রিক মডেল: সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নেন্স দর্শনের একটি মূল ভিত্তি হলো শেয়ারহোল্ডার-কেন্দ্রিকতা বা shareholder primacy, যেখানে বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার প্রধান দায়িত্ব শেয়ারহোল্ডারের মূল্য বাড়ানো বলে ঐতিহাসিকভাবে বিবেচিত হয়। এটি আমাদের সিরিজের পরে আলোচিত জার্মানির মতো স্টেকহোল্ডার-কেন্দ্রিক মডেল থেকে আলাদা, যেখানে কর্মীদের প্রতিনিধিত্বও বোর্ডের একটি আনুষ্ঠানিক অংশ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রেও "স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজম" নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, এবং বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পরিবেশ, কর্মী ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকেও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কেস স্টাডি
অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত একটি কাল্পনিক টেক কোম্পানি
প্রেক্ষাপট: এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক কাল্পনিক দৃশ্যকল্প, যেখানে একটি দ্রুত বর্ধনশীল টেক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা একাই চেয়ারম্যান, সিইও এবং বোর্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাধিকারের অধিকারী, বিশেষ শ্রেণির শেয়ারের মাধ্যমে।
সমস্যা: বোর্ডে স্বাধীন পরিচালক থাকলেও তাদের প্রস্তাব কার্যত প্রতিষ্ঠাতার ভোটাধিকারের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে, ফলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অধিগ্রহণ সিদ্ধান্ত পর্যাপ্ত বিতর্ক ছাড়াই পাস হয়ে যায়।
সমাধান: পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীদের চাপে কোম্পানিটি একজন লিড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টরকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়, যাতে তিনি প্রতিষ্ঠাতার অনুপস্থিতিতেও স্বাধীন পরিচালকদের সভা ডাকতে পারেন এবং বড় সিদ্ধান্তে আলাদা পর্যালোচনা প্রক্রিয়া যুক্ত করা হয়।
বিশ্বজুড়ে গভর্নেন্স তুলনা: এই সিরিজে যা থাকছে
যুক্তরাষ্ট্রের এই এক-স্তর, শেয়ারহোল্ডার-কেন্দ্রিক মডেল বিশ্বের একমাত্র পথ নয়। যুক্তরাজ্যে comply-or-explain নীতির জন্মস্থান, যেখান থেকে বাংলাদেশের কোড-২০১৮ ও অনুপ্রাণিত। জার্মানিতে সম্পূর্ণ আলাদা দুই-স্তর বোর্ড কাঠামো এবং কর্মী প্রতিনিধিত্ব প্রচলিত। জাপান ঐতিহ্যবাহী বন্ধ কাঠামো থেকে সরে এসে স্বাধীন পরিচালকের দিকে এগিয়েছে। ভারতে SEBI-র নিয়মনীতি আমাদের বিএসইসি কোডের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি মডেল। চীনে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কাঠামো দেখা যায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানা গভর্নেন্সের কেন্দ্রে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া এশিয়ার দুটি উদীয়মান বাজার, যারা নিজ নিজ কোড দিয়ে আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। আফ্রিকার উদীয়মান বাজারে দক্ষিণ আফ্রিকার King Code বিশ্বজুড়ে একটি মডেল হয়ে উঠেছে। শেষে আমরা বাংলাদেশকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সরাসরি তুলনা করব।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, একটি নির্দিষ্ট দেশের গভর্নেন্স মডেল কেন অন্য দেশে হুবহু কপি করা যায় না?
গভর্নেন্স মডেল একটি দেশের আইনি ব্যবস্থা, মালিকানার কাঠামো, পুঁজিবাজারের গভীরতা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষিপ্ত শেয়ারহোল্ডারের সংখ্যা অনেক বেশি, তাই বোর্ডের স্বাধীনতা সেখানে মূল ফোকাস। বাংলাদেশের মতো দেশে পারিবারিক ও গোষ্ঠীভিত্তিক মালিকানা বেশি প্রাধান্য পায়, তাই সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেনের স্বচ্ছতা তুলনামূলক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
উপসংহার
যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নেন্স মডেল আমাদের শেখায়, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ থাকলেও বোর্ডের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির অভাব থাকলে বড় কেলেঙ্কারি ঘটতে পারে। Enron ও WorldCom-এর শিক্ষা থেকে তৈরি Sarbanes-Oxley Act আজও বিশ্বজুড়ে অডিট কমিটি ও আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। পরের লেখায় আমরা যাচ্ছি যুক্তরাজ্যে, যেখান থেকে comply-or-explain নীতির জন্ম, এবং যার প্রভাব সরাসরি আমাদের নিজের বিএসইসি কোড-২০১৮ তে দেখা যায়।
প্রশ্নোত্তর
যুক্তরাষ্ট্রে কর্পোরেট আইন কি ফেডারেল সরকার তৈরি করে?
না, কোম্পানি নিবন্ধন ও মূল কর্পোরেট আইন মূলত রাজ্য পর্যায়ে তৈরি হয়, বেশিরভাগ বড় কোম্পানিই ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে নিবন্ধিত। তবে পুঁজিবাজার ও তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত নিয়ম ফেডারেল সংস্থা SEC নির্ধারণ করে।
CEO duality কী এবং এটি কি নিষিদ্ধ?
একই ব্যক্তি চেয়ারম্যান ও সিইও হওয়াকে CEO duality বলে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি নিষিদ্ধ নয় এবং বেশ প্রচলিত, যদিও গভর্নেন্স বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই এই পদ দুটি আলাদা রাখার পরামর্শ দেন।
Sarbanes-Oxley Act কাদের ওপর প্রযোজ্য?
যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি, এবং কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্ত বিদেশি কোম্পানির ওপরও এই আইন প্রযোজ্য।
Dodd-Frank Act কী সমস্যার সমাধানে তৈরি হয়েছিল?
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ এবং নির্বাহী বেতন কাঠামোর সমস্যা সমাধানের জন্য এই আইন তৈরি হয়।
say-on-pay ভোট কি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বাধ্যতামূলক ক্ষমতা দেয়?
না, এই ভোট সাধারণত পরামর্শমূলক, অর্থাৎ বোর্ড তা মানতে বাধ্য নয়, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক ভোট এলে তা বোর্ডের ওপর বড় রাজনৈতিক ও সুনামগত চাপ তৈরি করে।
Enron কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
নিরীক্ষক যদি একই সাথে লাভজনক পরামর্শী সেবা দেয়, তাহলে তার স্বাধীন মতামত দেওয়ার ক্ষমতা ঝুঁকিতে পড়ে, যা পরবর্তীতে নিরীক্ষা ও পরামর্শী সেবা পৃথকীকরণের নিয়মে রূপ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মডেল কি শেয়ারহোল্ডার-কেন্দ্রিক না স্টেকহোল্ডার-কেন্দ্রিক?
ঐতিহাসিকভাবে শেয়ারহোল্ডার-কেন্দ্রিক, যদিও সম্প্রতি স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজম নিয়ে আলোচনা বাড়ছে এবং অনেক বড় বিনিয়োগকারী পরিবেশ ও সামাজিক বিষয়কেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বাংলাদেশের কোড-২০১৮ এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মডেলের মূল পার্থক্য কী?
বাংলাদেশে কোড comply-or-explain নীতিতে চলে এবং চেয়ারম্যান-এমডি পদ আলাদা রাখা বাধ্যতামূলক, অথচ যুক্তরাষ্ট্রে এই বিভাজন ঐচ্ছিক এবং নিয়ম মূলত বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের ওপর কেন্দ্রীভূত।
Arthur Andersen-এর কী হয়েছিল?
Enron কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার দায়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর গ্রাহকের আস্থা হারিয়ে ফার্মটি কার্যত ভেঙে যায়, যদিও পরে একটি সংশ্লিষ্ট রায় আংশিকভাবে বাতিল হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির সুনাম তার আগেই অপরিবর্তনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।
ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে এত কোম্পানি নিবন্ধিত কেন?
ডেলাওয়্যারের কোম্পানি আইন সুনির্দিষ্ট, সময়ের সাথে পরীক্ষিত এবং এখানে একটি বিশেষায়িত আদালত (Court of Chancery) আছে, যা কর্পোরেট বিরোধ দ্রুত ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করে।
মূল বিষয়সমূহ
- ●যুক্তরাষ্ট্রে এক-স্তর বোর্ড মডেল প্রচলিত, যেখানে নির্বাহী ও স্বাধীন পরিচালক একই বোর্ডে বসেন।
- ●SEC ১৯৩৪ সাল থেকে পুঁজিবাজারের তথ্য প্রকাশ ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তদারকি করে।
- ●Enron ও WorldCom কেলেঙ্কারির জবাবে ২০০২ সালে Sarbanes-Oxley Act পাস হয়, যা অডিট কমিটির স্বাধীনতা ও সিইও/সিএফও সত্যায়ন বাধ্যতামূলক করে।
- ●২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর Dodd-Frank Act নির্বাহী বেতন কাঠামো ও শেয়ারহোল্ডার say-on-pay ভোটের অধিকার তৈরি করে।
- ●CEO duality, একই ব্যক্তি চেয়ারম্যান ও সিইও হওয়া, যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ চর্চা, যা অনেক অন্য দেশে নিষিদ্ধ বা নিরুৎসাহিত।
- ●যুক্তরাষ্ট্রের মডেল ঐতিহাসিকভাবে শেয়ারহোল্ডার-কেন্দ্রিক, যদিও স্টেকহোল্ডার ক্যাপিটালিজমের আলোচনা বাড়ছে।
- ●প্রতিটি দেশের গভর্নেন্স মডেল তার নিজস্ব আইনি ইতিহাস ও মালিকানা কাঠামোর ফল, তাই একটি মডেল হুবহু কপি করা যায় না।