আফ্রিকার উদীয়মান বাজারে কর্পোরেট গভর্নেন্স: King Code থেকে Steinhoff পর্যন্ত
04 অক্টো 2026 তারিখে প্রকাশিত
মালয়েশিয়ার 1MDB-পরবর্তী সংস্কারের পর আমরা আফ্রিকা মহাদেশে আসছি, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বের কর্পোরেট গভর্নেন্স ইতিহাসে একটি অগ্রণী ও বহুল অনুকরণীয় ভূমিকা রেখেছে। একই সাথে এই মহাদেশের বৃহত্তম একটি কর্পোরেট কেলেঙ্কারির গল্পও এখান থেকেই এসেছে, যা আমাদের কর্পোরেট গভর্নেন্স কী লেখায় আলোচিত স্বচ্ছতা স্তম্ভের গুরুত্ব আরও একবার স্পষ্ট করে।
King Code: দক্ষিণ আফ্রিকার পথপ্রদর্শক অবদান
দক্ষিণ আফ্রিকার Institute of Directors in Southern Africa বা IoDSA-র উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে প্রথম King Report প্রকাশিত হয়, যা King I নামে পরিচিত। এর পর ২০০২ সালে King II, ২০০৯ সালে King III এবং ২০১৬ সালে King IV প্রকাশিত হয়। King Code বিশ্বজুড়ে গভর্নেন্স কোডের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে, কারণ এটি আমাদের আগে আলোচিত যুক্তরাজ্যের Cadbury Report-এর কাছাকাছি সময়েই নিজস্বভাবে "apply and explain" দর্শনের একটি পথপ্রদর্শক রূপ তৈরি করে, এবং পরবর্তীতে এটি সমন্বিত প্রতিবেদন বা integrated reporting ধারণার ক্ষেত্রেও বিশ্বকে পথ দেখায়, যেখানে আর্থিক ও সামাজিক-পরিবেশগত কর্মক্ষমতা একসাথে একটি প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়।
Johannesburg Stock Exchange বা JSE তাদের লিস্টিং রিকোয়ারমেন্টের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে King Code পরিপালনের বিবরণী প্রকাশ করতে বাধ্য করে। King IV এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো, এটি শুধু বোর্ড কাঠামোর ওপর কেন্দ্রীভূত না থেকে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক "আউটকাম", যেমন নৈতিক সংস্কৃতি, কার্যকর তদারকি এবং দায়িত্বশীল কর্পোরেট নাগরিকত্বের ওপর জোর দেয়, যা আমাদের OECD চার স্তম্ভের দায়িত্বশীলতা অংশের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, একটি উদীয়মান অর্থনীতি কীভাবে বিশ্বব্যাপী গভর্নেন্স তত্ত্বে পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে?
দক্ষিণ আফ্রিকা দেখিয়েছে, গভর্নেন্স উদ্ভাবনের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হওয়ার প্রয়োজন নেই। ১৯৯০-র দশকে বর্ণবাদবিরোধী রূপান্তরের সময় দেশটির ব্যবসায়িক সম্প্রদায় বুঝেছিল, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরে পেতে হলে স্বচ্ছতা ও নৈতিক নেতৃত্বে বিশ্বমানের অবস্থান নিতে হবে, এবং এই প্রয়োজনীয়তাই King Code-এর মতো একটি অগ্রগামী উদ্যোগের জন্ম দেয়।
নাইজেরিয়া ও কেনিয়ার নিয়ন্ত্রক কাঠামো
দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরেও আফ্রিকার অন্য উদীয়মান বাজারগুলো নিজস্ব গভর্নেন্স কোড তৈরি করেছে। নাইজেরিয়ায় Financial Reporting Council of Nigeria ২০১৮ সালে Nigerian Code of Corporate Governance প্রকাশ করে, যা ব্যাংকিং, বিমা ও পুঁজিবাজারের মতো বিভিন্ন খাতে আগে বিক্ষিপ্তভাবে থাকা একাধিক কোডকে একত্রিত করে একটি সুসংগঠিত জাতীয় কোডে রূপ দেয়। কেনিয়ায় Capital Markets Authority তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য একটি গভর্নেন্স কোড নির্ধারণ করে, যা পূর্ব আফ্রিকার পুঁজিবাজারে একটি অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এই দুটি দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, আফ্রিকার উদীয়মান বাজারগুলো একে অপরের থেকে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার King Code থেকে শিখে নিজস্ব প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কোড গড়ে তুলছে।
Steinhoff কেলেঙ্কারি: একটি বিশ্বব্যাপী সতর্কসংকেত
গল্পে বলি
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার আন্তর্জাতিক আসবাবপত্র ও খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান Steinhoff International-এর শেয়ারের দাম একদিনেই প্রায় নব্বই শতাংশ ধসে পড়ে, যখন কোম্পানির দীর্ঘদিনের সিইও আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন এবং কোম্পানি তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে "অ্যাকাউন্টিং অনিয়ম" স্বীকার করে। পরবর্তী স্বাধীন তদন্তে প্রকাশ পায়, বছরের পর বছর ধরে জটিল আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃত্রিম লেনদেন তৈরি করে কোম্পানির মুনাফা ও সম্পদমূল্য ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। এই ঘটনায় বিনিয়োগকারীরা বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্য হারান এবং এটি ইউরোপ ও আফ্রিকার পুঁজিবাজারে একযোগে প্রভাব ফেলে, কারণ কোম্পানিটি জোহানেসবার্গ ও ফ্রাঙ্কফুর্ট, দুই এক্সচেঞ্জেই তালিকাভুক্ত ছিল।
তদন্তে এটিও প্রকাশ পায়, কোম্পানির বোর্ড এবং অডিট কমিটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থাপনার জটিল আন্তর্জাতিক কাঠামোর প্রকৃত প্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল, এবং নিরীক্ষকরাও এই জটিলতার আড়ালে থাকা ঝুঁকি পর্যাপ্তভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি। এই ঘটনা King Code-এর পথপ্রদর্শক সুনামের বিপরীতে একটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে, সর্বোত্তম কোড থাকলেও বোর্ডের প্রকৃত বোঝাপড়া ও প্রশ্ন তোলার সংস্কৃতি দুর্বল হলে বিপর্যয় এড়ানো যায় না।
| বিষয় | ধাপ |
|---|---|
| ১৯৯৪: King I | ১ |
| ২০০২: King II | ২ |
| ২০০৯: King III (Integrated Reporting) | ৩ |
| ২০১৬: King IV (Outcomes-based) | ৪ |
কোম্পানিগুলো সাধারণত যেসব ভুল করে
-
1
বোর্ডের জটিল আন্তর্জাতিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে না বোঝা
Steinhoff-এ বোর্ড ব্যবস্থাপনার তৈরি করা বহু-স্তরীয় আন্তর্জাতিক সহযোগী নেটওয়ার্কের প্রকৃত প্রকৃতি ও ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।
-
2
সর্বোত্তম কোডের উপস্থিতিকে সুরক্ষার গ্যারান্টি মনে করা
King Code বিশ্বমানের হলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতারণা রোধ করে না, কোডের নীতি বোর্ডের প্রকৃত আচরণে রূপান্তরিত হতে হয়।
-
3
একাধিক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তিকে অতিরিক্ত নিরাপত্তার প্রমাণ মনে করা
দুই আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হলেও Steinhoff-এর জালিয়াতি বহু বছর অলক্ষিত ছিল, কারণ উভয় এক্সচেঞ্জের তদারকিই একই অন্তর্নিহিত জটিল কাঠামো ভেদ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
কেস স্টাডি
অডিট কমিটির সীমিত আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রেক্ষাপট: এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক কাল্পনিক দৃশ্যকল্প, যেখানে একটি দক্ষিণ আফ্রিকান খুচরা বিক্রয় গোষ্ঠী একাধিক দেশে সহযোগী প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছিল।
সমস্যা: অডিট কমিটির সদস্যরা মূলত স্থানীয় হিসাব অনুশীলনে অভিজ্ঞ ছিলেন, কিন্তু আন্তর্জাতিক জটিল করকাঠামো ও আন্তঃসীমান্ত লেনদেন মূল্যায়নে পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব ছিল।
সমাধান: বোর্ড একজন আন্তর্জাতিক ফরেনসিক হিসাব বিশেষজ্ঞকে অডিট কমিটির পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়, যিনি নিয়মিতভাবে আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের একটি স্বতন্ত্র প্রযুক্তিগত পর্যালোচনা প্রদান করেন, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
আপনি কি কখনো ভেবেছেন, Steinhoff-এর পতন King Code-এর সুনামকে আসলে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
অনেকে ভেবেছিলেন এই কেলেঙ্কারি King Code-এর বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধাক্কা দেবে, কিন্তু বাস্তবে এটি কোডের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, কারণ বিশ্লেষকরা দেখিয়েছেন সমস্যাটি কোডের নীতিতে ছিল না, বরং বোর্ডের বাস্তবিক প্রয়োগ ও আন্তর্জাতিক জটিলতা বোঝার সীমাবদ্ধতায় ছিল।
উপসংহার
আফ্রিকার উদীয়মান বাজারের অভিজ্ঞতা, King Code-এর পথপ্রদর্শক অবদান থেকে Steinhoff-এর পতন পর্যন্ত, আমাদের দেখায় একটি বিশ্বমানের কোডও বোর্ডের প্রকৃত বোঝাপড়া ও সজাগ তদারকির বিকল্প হতে পারে না। শেষ লেখায় আমরা বাংলাদেশকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সরাসরি তুলনা করব, এই পুরো সিরিজের শিক্ষাকে একসাথে নিয়ে।
প্রশ্নোত্তর
King Code কে প্রকাশ করে?
দক্ষিণ আফ্রিকার Institute of Directors in Southern Africa বা IoDSA, প্রথম সংস্করণ King I প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে।
King IV এর মূল নতুনত্ব কী?
এটি শুধু বোর্ড কাঠামোর ওপর কেন্দ্রীভূত না থেকে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক আউটকাম, নৈতিক সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীল কর্পোরেট নাগরিকত্বের ওপর জোর দেয়।
Steinhoff কেলেঙ্কারিতে কী ঘটেছিল?
কোম্পানিটি জটিল আন্তর্জাতিক সহযোগী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কৃত্রিম লেনদেন তৈরি করে বছরের পর বছর মুনাফা ও সম্পদমূল্য বাড়িয়ে দেখিয়েছিল, যা ২০১৭ সালে প্রকাশ পায়।
Steinhoff কোন কোন এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত ছিল?
জোহানেসবার্গ স্টক এক্সচেঞ্জ (JSE) ও ফ্রাঙ্কফুর্ট স্টক এক্সচেঞ্জ, দুই জায়গাতেই।
নাইজেরিয়ার গভর্নেন্স কোড কবে প্রকাশিত হয়?
২০১৮ সালে, Financial Reporting Council of Nigeria এর মাধ্যমে, যা একাধিক খাতভিত্তিক পুরোনো কোডকে একত্রিত করে একটি জাতীয় কোড তৈরি করে।
কেনিয়ার গভর্নেন্স কোড কে নির্ধারণ করে?
কেনিয়ার Capital Markets Authority তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য গভর্নেন্স কোড নির্ধারণ করে।
King Code কি apply-or-explain নীতিতে কাজ করে?
হ্যাঁ, এবং এটি এই দর্শনের একটি প্রথম দিকের ও প্রভাবশালী প্রয়োগ, যা পরে মালয়েশিয়ার মতো অন্য দেশের কোডেও প্রতিফলিত হয়েছে।
Steinhoff-এর পতন কি King Code-এর ব্যর্থতা প্রমাণ করে?
বিশ্লেষকদের মতে সমস্যাটি কোডের নীতিতে ছিল না, বরং বোর্ডের আন্তর্জাতিক জটিল কাঠামো বোঝা ও বাস্তবে প্রয়োগের সীমাবদ্ধতায় ছিল।
মূল বিষয়সমূহ
- ●দক্ষিণ আফ্রিকার King Code (King I থেকে King IV) বিশ্বজুড়ে apply-or-explain ও সমন্বিত প্রতিবেদনের একটি পথপ্রদর্শক মডেল।
- ●IoDSA King Code প্রকাশ করে এবং JSE তাদের লিস্টিং রিকোয়ারমেন্টের মাধ্যমে পরিপালন বাধ্যতামূলক করে।
- ●নাইজেরিয়া (২০১৮) ও কেনিয়া নিজস্ব জাতীয় গভর্নেন্স কোড গড়ে তুলেছে, যা King Code ও আন্তর্জাতিক মূলধারা থেকে প্রভাবিত।
- ●২০১৭ সালের Steinhoff International কেলেঙ্কারিতে জটিল আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বছরের পর বছর মুনাফা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল।
- ●Steinhoff দেখায়, বিশ্বমানের কোড থাকলেও বোর্ডের জটিল কাঠামো বোঝার সীমাবদ্ধতা বড় প্রতারণাকে বছরের পর বছর আড়াল রাখতে পারে।
- ●একাধিক আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়তি সুরক্ষার গ্যারান্টি দেয় না।