মূল অংশে যান
Tame Academy

OECD/G20 Principles of Corporate Governance

04 অক্টো 2026 তারিখে প্রকাশিত

OECD/G20 Principles of Corporate Governance

আমাদের কর্পোরেট গভর্নেন্স কী নিয়ে প্রথম লেখায় আমরা সংক্ষেপে OECD এর চারটি স্তম্ভ, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, ন্যায্যতা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এই চারটি স্তম্ভ আসলে একটি অনেক বড় এবং আনুষ্ঠানিক দলিলের সরলীকৃত সার, যার পূর্ণ নাম G20/OECD Principles of Corporate Governance। এই লেখায় আমরা সেই মূল দলিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, এর ইতিহাস, কাঠামো এবং বাংলাদেশের নিজস্ব কোডের সাথে এর সম্পর্ক।

বিজ্ঞাপনের জায়গা (সংরক্ষিত)

OECD কী এবং কেন এই নীতিমালা তৈরি করে

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা, সংক্ষেপে OECD, প্রধানত উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর একটি আন্তঃসরকার সংস্থা, যা অর্থনৈতিক নীতি, বাণিজ্য এবং আর্থিক বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গবেষণা ও নীতি সুপারিশ তৈরি করে। নব্বইয়ের দশকের শেষে বিশ্বব্যাপী একাধিক বড় কর্পোরেট কেলেঙ্কারির পর বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা থেকে OECD প্রথমবার একটি আন্তর্জাতিক কর্পোরেট গভর্নেন্স নীতিমালা প্রকাশ করে, যা পরবর্তীতে একাধিকবার হালনাগাদ হয়েছে।

ইতিহাস ও G20 এর অনুমোদন

এই নীতিমালা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে এবং পরে ২০০৪ সালে একবার ব্যাপকভাবে হালনাগাদ করা হয়। ২০১৫ সালে এটি আবারও পুনর্লিখিত হয় এবং এই সংস্করণে G20 দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরদের অনুমোদন পায়, যার ফলে এর নাম বদলে হয় "G20/OECD Principles of Corporate Governance"। এই যৌথ অনুমোদন নীতিমালাটিকে কেবল একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর যৌথভাবে সমর্থিত একটি মানদণ্ডে উন্নীত করে।

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, বাংলাদেশ G20 এর সদস্য না হয়েও কেন এই নীতিমালার প্রভাব বাংলাদেশের কোডে এত স্পষ্ট?

কারণ এই নীতিমালা কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত সেরা চর্চার কাঠামো, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করে নিজ নিজ কোড তৈরি করে। বাংলাদেশের বিএসইসি কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড-২০১৮ ও এই আন্তর্জাতিক নীতিমালার কাঠামো থেকে বহু ধারণা ধার করেছে।

ছয়টি মূল অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

২০১৫ সালের সংস্করণে নীতিমালাটি ছয়টি বড় অধ্যায়ে বিভক্ত, যার প্রতিটি গভর্নেন্সের একটি ভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলে।

  • কার্যকর গভর্নেন্স কাঠামোর ভিত্তি। একটি দেশে গভর্নেন্স কার্যকর হওয়ার জন্য আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো কেমন হওয়া উচিত।
  • শেয়ারহোল্ডারের অধিকার ও সমতা। সব শেয়ারহোল্ডারের জন্য ন্যায্য আচরণ ও মালিকানার মৌলিক অধিকার সুরক্ষা।
  • প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বাজার মধ্যস্থতাকারী। বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা ও দায়িত্ব।
  • স্টেকহোল্ডারের ভূমিকা। কর্মী, পাওনাদার ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা।
  • প্রকাশ ও স্বচ্ছতা। আর্থিক ও অ-আর্থিক তথ্য সময়মতো ও সঠিকভাবে প্রকাশ।
  • বোর্ডের দায়িত্ব। বোর্ডের কৌশলগত নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনার তদারকির দায়িত্ব।

আমাদের হাব লেখায় উল্লেখিত স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, ন্যায্যতা ও দায়িত্বশীলতার চার স্তম্ভ মূলত এই ছয়টি অধ্যায়ের বার্তাকেই একটি সহজ, স্মরণীয় রূপে সংক্ষিপ্त করে।

G20/OECD নীতিমালার বিকাশের সময়রেখা
১৯৯৯: প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯: প্রথম প্রকাশ ২০০৪: প্রথম ব্যাপক হালনাগাদ ২০০৪: প্রথম ব্যাপক হালনাগাদ ২০১৫: G20 অনুমোদিত সংস্করণ ২০১৫: G20 অনুমোদিত সংস্করণ পরবর্তী হালনাগাদ: টেকসইতা ও নতুন ঝুঁকি অন্তর্ভুক্তি পরবর্তী হালনাগাদ: টেকসইতা ও নতুন ঝুঁকি অন্তর্ভুক্তি
বিষয় ধাপ
১৯৯৯: প্রথম প্রকাশ ১
২০০৪: প্রথম ব্যাপক হালনাগাদ ২
২০১৫: G20 অনুমোদিত সংস্করণ ৩
পরবর্তী হালনাগাদ: টেকসইতা ও নতুন ঝুঁকি অন্তর্ভুক্তি ৪
বিজ্ঞাপনের জায়গা (সংরক্ষিত)

গল্পে বলি

বাংলাদেশে নতুন একটি গভর্নেন্স কোড প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কারিগরি দল বিভিন্ন দেশের কোড পর্যালোচনা করছিল, কোনটি বাংলাদেশের বাজার কাঠামোর সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ তা বোঝার জন্য। তারা দেখে, যে দেশগুলোর কোড সরাসরি G20/OECD নীতিমালার কাঠামো অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বোঝার এবং তুলনা করার কাজ অনেক সহজ হয়, কারণ তারা পরিভাষা ও কাঠামোর সাথে আগে থেকেই পরিচিত।

এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বাংলাদেশের কোডও একই রকম কাঠামো, বোর্ডের দায়িত্ব, প্রকাশ ও স্বচ্ছতা, শেয়ারহোল্ডার অধিকার, অনুসরণ করে তৈরি হয়, যদিও প্রতিটি শর্তের সংখ্যাগত বিস্তারিত স্থানীয় বাজারের প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করা হয়েছে।

কোম্পানিগুলো সাধারণত যেসব ভুল করে

  1. 1

    আন্তর্জাতিক নীতিমালাকে কেবল তাত্ত্বিক দলিল মনে করা

    বাস্তবে এই নীতিমালা বিশ্বের বহু দেশের বাধ্যতামূলক কোডের ভিত্তি তৈরি করেছে, এটি নিছক একাডেমিক আলোচনা নয়।

  2. 2

    নীতিমালার হালনাগাদ সম্পর্কে অবগত না থাকা

    সময়ের সাথে নীতিমালায় নতুন ঝুঁকি ও বিষয় যুক্ত হয়, যা স্থানীয় কোডের ভবিষ্যৎ সংশোধনের দিক নির্দেশ করতে পারে।

  3. 3

    চার স্তম্ভের সরলীকরণকেই সম্পূর্ণ নীতিমালা মনে করা

    স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-ন্যায্যতা-দায়িত্বশীলতা একটি সহায়ক সরলীকরণ, কিন্তু মূল দলিলে আরও বিস্তারিত নির্দেশনা আছে।

  4. 4

    G20 অনুমোদনের তাৎপর্য উপলব্ধি না করা

    এই অনুমোদন নীতিমালাটিকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর যৌথ সমর্থনপ্রাপ্ত একটি মানদণ্ডে পরিণত করেছে, যা এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বাড়িয়েছে।

বাস্তব কেস স্টাডি

কেস স্টাডি

নীতিমালার কাঠামো অনুসরণ করে কোড আধুনিকীকরণ

প্রেক্ষাপট: এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক কাল্পনিক দৃশ্যকল্প, যেখানে একটি উদীয়মান অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের পুরনো, সংক্ষিপ্ত গভর্নেন্স কোড আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা করছিল।

সমস্যা: পুরনো কোডে স্টেকহোল্ডারের ভূমিকা এবং প্রকাশ ও স্বচ্ছতা সংক্রান্ত অধ্যায় ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে অপ্রতুল মনে হচ্ছিল।

সমাধান: নিয়ন্ত্রক সংস্থা G20/OECD নীতিমালার ছয়টি অধ্যায়ের কাঠামো অনুসরণ করে কোড পুনর্গঠন করে, যা আন্তর্জাতিক তুলনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী কেন একাধিক দেশের কোম্পানি তুলনা করার সময় G20/OECD নীতিমালার পরিভাষা খুঁজে বেড়ান?

কারণ এই পরিচিত কাঠামো তাদের দ্রুত বুঝতে সাহায্য করে একটি কোম্পানির গভর্নেন্স কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, দেশভেদে ভিন্ন পরিভাষা শিখে নেওয়ার বাড়তি কাজ ছাড়াই।

উপসংহার

G20/OECD Principles of Corporate Governance বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট গভর্নেন্স নিয়ন্ত্রণের একটি অদৃশ্য কিন্তু অপরিহার্য ভিত্তি তৈরি করেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের নিজস্ব কোডেও স্পষ্ট। ICGN Global Governance Principles নিয়ে আমাদের পরের লেখায় আমরা দেখব বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকে গভর্নেন্স নীতিমালা কেমন দেখায়। কর্পোরেট গভর্নেন্স কী তা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে চাইলে আমাদের গভর্নেন্স বিভাগে ঘুরে আসতে পারেন।

প্রশ্নোত্তর

G20/OECD Principles of Corporate Governance প্রথম কবে প্রকাশিত হয়?

মূল OECD নীতিমালা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে, পরে ২০০৪ এবং ২০১৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে হালনাগাদ হয়।

G20 অনুমোদনের অর্থ কী?

২০১৫ সালের সংস্করণ G20 দেশগুলোর অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরদের অনুমোদন পায়, যা এর গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

এই নীতিমালা কি বাংলাদেশের জন্য আইনত বাধ্যতামূলক?

না, এটি একটি স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক কাঠামো, যা দেশগুলো তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করে নিজ নিজ বাধ্যতামূলক কোড তৈরি করে।

নীতিমালার ছয়টি অধ্যায়ের মধ্যে কোনটি বাংলাদেশের কোডে সবচেয়ে স্পষ্ট?

বোর্ডের দায়িত্ব এবং প্রকাশ ও স্বচ্ছতা অধ্যায়ের প্রভাব বিএসইসি কোড-২০১৮ এর কন্ডিশন ১ ও কন্ডিশন ৯ এ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

হাব লেখার চার স্তম্ভ আর এই ছয় অধ্যায়ের সম্পর্ক কী?

চার স্তম্ভ, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, ন্যায্যতা ও দায়িত্বশীলতা, মূল ছয় অধ্যায়ের বার্তাকে একটি সহজ, স্মরণীয় সারসংক্ষেপে উপস্থাপন করে।

OECD কোন ধরনের সংস্থা?

এটি একটি আন্তঃসরকার অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা, প্রধানত উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সদস্যপদসহ।

নীতিমালা কি নিয়মিত হালনাগাদ হয়?

হ্যাঁ, বিশ্ব অর্থনীতি ও বাজারের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে সময়ে সময়ে এটি পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হয়।

একটি কোম্পানি সরাসরি এই নীতিমালা উদ্ধৃত করতে পারে কি?

বার্ষিক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সেরা চর্চার প্রসঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে, তবে আইনগত বাধ্যবাধকতা আসে স্থানীয় কোড থেকে।

মূল বিষয়সমূহ

  • ●G20/OECD Principles of Corporate Governance প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে এবং ২০১৫ সালে G20 অনুমোদিত সংস্করণ পায়।
  • ●নীতিমালাটি ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত, গভর্নেন্স কাঠামোর ভিত্তি, শেয়ারহোল্ডার অধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, স্টেকহোল্ডার, প্রকাশ ও স্বচ্ছতা, এবং বোর্ডের দায়িত্ব।
  • ●হাব লেখার চার স্তম্ভ এই ছয় অধ্যায়ের একটি সহজ সারসংক্ষেপ মাত্র।
  • ●বাংলাদেশের বিএসইসি কোড-২০১৮ এই আন্তর্জাতিক কাঠামো থেকে বহু ধারণা ধার করে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করেছে।
  • ●এই নীতিমালা আইনত বাধ্যতামূলক না হলেও বিশ্বজুড়ে নিয়ন্ত্রক কোডের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
  • ●পরিচিত আন্তর্জাতিক কাঠামো অনুসরণ করলে একটি দেশের কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি বোধগম্য হয়।
শেয়ার করুন: