মূল অংশে যান
Tame Academy

দক্ষিণ এশিয়ায় কর্পোরেট গভর্নেন্সের বিকাশ

03 অক্টো 2026 তারিখে প্রকাশিত

দক্ষিণ এশিয়ায় কর্পোরেট গভর্নেন্সের বিকাশ

বাংলাদেশের একক গল্পের বাইরে তাকালে দেখা যায়, গোটা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল একই রকম একটি যাত্রার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে একুশ শতকের প্রথম দুই দশক জুড়ে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ, প্রতিটি দেশই নিজস্ব বাজারের বাস্তবতা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক গভর্নেন্স নীতিকে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। বড় প্রেক্ষাপটের জন্য পড়তে পারেন বিশ্বে কর্পোরেট গভর্নেন্সের ইতিহাস শীর্ষক লেখাটি।

ভারত, Clause 49 থেকে SEBI LODR পর্যন্ত

ভারতে কর্পোরেট গভর্নেন্সের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় কুমার মঙ্গলম বিড়লা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে, যা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া বা SEBI এর লিস্টিং এগ্রিমেন্টের ক্লজ ৪৯ হিসেবে পরিচিতি পায়। পরবর্তীতে নারায়ণ মূর্তি কমিটির সুপারিশে এটি আরও সংশোধিত হয়। বহু বছর ধরে ক্লজ ৪৯ ভারতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর গভর্নেন্সের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করার পর, ২০১৫ সালে SEBI একটি আরও বিস্তারিত ও আধুনিক কাঠামো চালু করে, যার নাম SEBI Listing Obligations and Disclosure Requirements Regulations, সংক্ষেপে LODR।

পাকিস্তান, SECP এর কোড অফ কর্পোরেট গভর্নেন্স

পাকিস্তানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অফ পাকিস্তান, সংক্ষেপে SECP, ২০০২ সালে প্রথম কোড অফ কর্পোরেট গভর্নেন্স জারি করে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই কোড একাধিকবার সংশোধিত হয়, বোর্ডের স্বাধীনতা, নারী পরিচালকের প্রতিনিধিত্ব এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির মতো বিষয়গুলো ক্রমান্বয়ে অন্তর্ভুক্ত করে আধুনিকীকরণ করা হয়।

গল্পে বলি

দক্ষিণ এশিয়ার একজন আঞ্চলিক বিনিয়োগ পরামর্শকের কথা ভাবুন, যিনি একসাথে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের তিনটি কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন তুলনা করছেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে তিনটি দেশের কোডের মূল কাঠামোয় বিস্ময়কর মিল আছে, স্বাধীন পরিচালক, অডিট কমিটি, নমিনেশন কমিটি, প্রায় একই ধরনের শব্দ ও ধারণা। তার কাছে এটি স্পষ্ট হয় যে পুরো অঞ্চলই মূলত একই আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অনুপ্রাণিত, যদিও বাস্তবায়নের তীব্রতায় পার্থক্য আছে।

আপনি কি জানেন কেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গভর্নেন্স কোডে এত মিল পাওয়া যায়?

এর একটি বড় কারণ হলো, এই দেশগুলোর প্রায় সবাই OECD নীতিমালা এবং যুক্তরাজ্যের Cadbury Report থেকে উদ্ভূত আন্তর্জাতিক ভালো চর্চাকেই নিজেদের কোড তৈরির মূল রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে স্বাধীন পরিচালক, অডিট কমিটি বা কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইনের মতো ধারণাগুলো প্রায় প্রতিটি দেশের কোডেই কাছাকাছি রূপে দেখা যায়।

বিজ্ঞাপনের জায়গা (সংরক্ষিত)

শ্রীলঙ্কা, পেশাজীবী সংস্থার নেতৃত্বে একটি ভিন্ন পথ

শ্রীলঙ্কায় কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড তৈরির উদ্যোগ এসেছিল কিছুটা ভিন্নভাবে, মূলত দেশটির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ইনস্টিটিউট এবং পরবর্তীতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের যৌথ উদ্যোগে। কোড অফ বেস্ট প্র্যাকটিস অন কর্পোরেট গভর্নেন্স নামে পরিচিত এই দলিল সময়ের সাথে সাথে একাধিকবার হালনাগাদ হয়েছে, এবং এটি পেশাজীবী সংস্থার নেতৃত্বে গভর্নেন্স সংস্কারের একটি উল্লেখযোগ্য দক্ষিণ এশীয় উদাহরণ।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম জাতীয় গভর্নেন্স কোড চালুর আনুমানিক সময়রেখা
ভারত (SEBI Clause 49): 2000 ভারত (SEBI Clause 49) পাকিস্তান (SECP কোড): 2002 পাকিস্তান (SECP কোড) শ্রীলঙ্কা (Code of Best Practice): 2003 শ্রীলঙ্কা (Code of Best Practice) বাংলাদেশ (SEC গাইডলাইন): 2006 বাংলাদেশ (SEC গাইডলাইন)
বিষয় মান
ভারত (SEBI Clause 49) ২,০০০
পাকিস্তান (SECP কোড) ২,০০২
শ্রীলঙ্কা (Code of Best Practice) ২,০০৩
বাংলাদেশ (SEC গাইডলাইন) ২,০০৬

অঞ্চলজুড়ে অভিন্ন চ্যালেঞ্জ

আলাদা আলাদা কোড থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো অনেকটা একই রকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, পরিবারতান্ত্রিক মালিকানার আধিক্য, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি সক্ষমতা এবং নিয়ম বাস্তবায়নে অসঙ্গতি। পরিবার নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায় স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করা হলেও তাদের প্রকৃত প্রভাব কতটা, এই প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি দেশেই এখনো প্রাসঙ্গিক।

গল্পে বলি

একটি পারিবারিক ব্যবসাগোষ্ঠীর কথা ভাবুন, যা দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশেই তাদের ব্যবসা পরিচালনা করে। প্রতিটি দেশেই তারা আইন মেনে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করে, কিন্তু বাস্তবে বোর্ডের সিদ্ধান্তের বড় অংশই এখনো পরিবারের মূল সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে আইনি কাঠামো আর বাস্তব সংস্কৃতির মধ্যে ব্যবধান দূর করা পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জ।

আপনি কি মনে করেন শুধু আইন কড়া করলেই পরিবারতান্ত্রিক প্রভাবের সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে?

না, শুধু আইন কড়া করাই যথেষ্ট নয়। স্বাধীন পরিচালকদের প্রকৃত ক্ষমতা, তথ্যে প্রবেশাধিকার এবং সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে, শুধু কাগজে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ করেই প্রকৃত পরিবর্তন আশা করা কঠিন। এই কারণেই বাস্তবায়নের সংস্কৃতি আইনের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

উপসংহার

দক্ষিণ এশিয়ার কর্পোরেট গভর্নেন্সের ইতিহাস দেখায় যে প্রতিবেশী দেশগুলো আন্তর্জাতিক নীতিমালাকে নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী ভিন্নভাবে গ্রহণ করলেও, তাদের মৌলিক চ্যালেঞ্জ অনেকটাই অভিন্ন। বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন বাংলাদেশে কর্পোরেট গভর্নেন্সের যাত্রা শীর্ষক লেখাটি।

প্রশ্নোত্তর

ভারতের প্রথম কর্পোরেট গভর্নেন্স কাঠামোর নাম কী?

SEBI এর লিস্টিং এগ্রিমেন্টের ক্লজ ৪৯, যা কুমার মঙ্গলম বিড়লা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল এবং পরে SEBI LODR দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়।

পাকিস্তানে কর্পোরেট গভর্নেন্স কোড কে জারি করে?

সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অফ পাকিস্তান, সংক্ষেপে SECP, যারা ২০০২ সালে প্রথম কোড জারি করে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গভর্নেন্স কোডে প্রধান মিল কী?

স্বাধীন পরিচালক, অডিট কমিটি এবং কমপ্লাই অর এক্সপ্লেইন নীতির মতো ধারণা প্রায় প্রতিটি দেশের কোডেই অভিন্নভাবে পাওয়া যায়, কারণ সবাই একই আন্তর্জাতিক উৎস থেকে অনুপ্রাণিত।

অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

পরিবারতান্ত্রিক মালিকানার আধিক্য এবং নিয়ম বাস্তবায়নে দুর্বলতা, যা আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত গভর্নেন্স সংস্কৃতি গড়ে তোলা কঠিন করে তোলে।

শেয়ার করুন: